নবজাতক শিশুর যত্নে কিছু পরামর্শ যা আমরা সচরাচর খেয়াল করি না

তাবাছুম
তাবাছুম
শাহরিয়ার তাবাছুম

আজকের শিশু আগামীদিনের ভবিষ্যত। শিশুর ভবিষ্যত গড়ার দায়িত্ব পরিবারের সবারই। বাবা-মা দু’জনেরই ভূমিকা এক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ। আর এক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকাই প্রধান একটি শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে। একজন মা’ই পারেন শিশুর যথাযথ যত্ন নিয়ে তার সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তুলতে। আসুন আমরা জেনে নিই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সহায়ক প্রয়োজনীয় কিছু যত্ন সম্পর্কে।

১) একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার ত্বক খুবই কোমল ও নরম থাকে। এসময় তাদেরকে নতুন জামা-কাপড় পরতে দেয়া উচিত নয়। কারণ নতুন জামা-কাপড় বেশ খসখসে থাকে, যা শিশুর ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই শিশুকে পুরনো সুতির কাপড় পরানো উচিত। এতে শিশু আরাম পাবে।

২) শিশুর জন্মের ১ ঘন্টার মাঝে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এ দুধকে শাল দুধ বলে। এতে প্রচুর পুষ্টিগুণ থাকে। অনেকে প্রচলিত কুসংস্কার থেকে শিশুকে শালদুধ না খাইয়ে মধু খাওয়ান। এটা মোটেও ঠিক নয়। এতে শিশুর পেটে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৩) জন্মের প্রথম ৬ মাস বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। ৬ মাস পর বুকের দুধের পাশাপাশি নতুন খাবার শুরু করতে পারেন। তবে শিশুকে কখনোই খাবার খাওয়ার ব্যপারে অতিরিক্ত জোরাজুরি করবেন না। এতে খাবারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। এছাড়া খেয়াল রাখতে হবে শিশু বুকের দুধ নিয়মিত পাচ্ছে কিনা, বুকের দুধ টেনে খেতে পারছে কিনা, দুধ খেতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছে কিনা। আর এসময় মায়েদের বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। এতে মা ও সন্তান দুজনেরই স্বাস্থ্য ভাল থাকবে।

৪) তবে শুধু মা নয়, পরিবারের অন্য সব সদস্যদেরই উচিত শিশুর যত্ন নেয়া। তবে মা যেহেতু সন্তানের পাশে বেশি থাকেন তাই তিনি কিছু জিনিস অবশ্যই খেয়াল রাখবেন।

  • শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সাথে শিশুর বুক খুব বেশি নিচে নেমে যাচ্ছে কিনা।
  • বুকের দুধ খাওয়াতে অনীহা অথবা খেলেও বমি করে ফেলে দিচ্ছে কিনা।
  • সে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে কিনা।

এরকম কোন লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নেবেন।

৫) শিশুরা প্রস্রাব করবেই। এটাই স্বাভাবিক। বরং প্রস্রাব অনিয়মিত হলে সেটাই অস্বাভাবিক। তাই লক্ষ্য রাখুন সে দিনে কতবার প্রস্রাব করছে। দিনে কমপক্ষে স্বাভাবিকভাবে ৭-৮ বার প্রস্রাব হবে। এছাড়া অনেক মা সারাদিনই সন্তানকে ডায়াপার পরিয়ে রাখেন। এতে শিশুর চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই রাতে অন্তত শিশুকে স্বাভাবিক জামা-কাপড় পরিয়ে রাখুন।

৬) মায়েদের উচিত বসে থাকা অবস্থায় শিশুকে বুকের দুধপান করানো। কারণ শোয়া অবস্থায় দুধপান করালে শিশুর গলা ও কানের ভেতরে দুধ ঢুকে যেতে পারে।

৭) দুধ খাওয়ানোর মাঝে মাঝে এক বা একাধিকবার Burb Up পদ্ধতির মাধ্যমে গ্যাস বের করে দিন। এ মেকানিজমের অর্থ হচ্ছে শিশুকে সোজা করে বুকের সাথে ধরে রাখা। খাওয়ানোর পর বিছানায় শোয়ানোর আগে ৫-১০ মিনিট পর আবার Burb Up করে নিন। নয়তো কিন্তু শিশুর পেটে আবার গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে।

[youtube http://www.youtube.com/watch?v=W8yvnhWdyAs]

৮) এখনকার অনেক মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে আগ্রহী হন না। মায়ের বুকের দুধে থাকে ম্যাক্রোফেজ নামের উপাদান, যা বাজারে প্রাপ্ত গুঁড়ো দুধে পাওয়া যায় না। এই ম্যাক্রোফেজ উপাদান ল্যাক্টোফেরিন ও লাইসোজাইম কমপ্লিমেন্ট তৈরি করে যা শিশুর সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এছাড়া শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়েদের স্তন, জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। মায়ের দুধে Secretory IgA বেশি থাকে, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ করে। Taurine, Choline Arginine শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে সাহায্য করে।

৯) শিশুকে সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। বাথটাবে গোসল করালে শিশুর ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। শিশুকে উঁচু জায়গায় বসিয়ে রেখে গোসল করাতে পারেন। এতে গোসলে ব্যবহৃত পানি গড়িয়ে নিচে পড়ে যাবে। গরমকালে প্রতিদিন ও শীতকালে ১ বা ২ দিন পর পর শিশুকে গোসল করাতে পারেন। শিশুর নাক, কান ও হাতের নখ সব সময় পরিষ্কার রাখতে চেষ্টা করুন। শিশুর জামা-কাপড় গরম পানিতে স্যাভলন বা ডেটল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

১০) শিশুর ত্বক সব সময়ই নরম ও কোমল। জন্মের কিছুদিন পর শিশুর ত্বক স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে যায়। হাত দিয়ে শিশুর ত্বক ঘষবেন না, এতে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে, দেখা দিতে পারে সংক্রমণ। এছাড়া শিশুর নাভির অতিরিক্ত অংশ প্রাকৃতিকভাবেই ঝরে যেতে দিন।

সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান শিশু সব মায়ের কাম্য। আমরা একটু সচেতন হলেই আমাদের সন্তান সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উঠবে। আর আপনার শিশুকে নিয়মিত ৬ টি মারাত্মক রোগের টিকা দিতে ভুলবেন না।

পরামর্শ.কম এ স্বাস্থ্য ও রূপচর্চা বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো সংশ্লিষ্ট লেখকের ব্যক্তিগত মতামত ও সাধারণ তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত। তাই এসব লেখাকে সরাসরি চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য অথবা রূপচর্চা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। স্বাস্থ্য/ রূপচর্চা সংক্রান্ত যেকোন তথ্য কিংবা চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের/বিউটিশিয়ানের শরণাপন্ন হোন।

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করছি। পরামর্শ.কম এর অন্যান্য প্রকাশনার আপডেট পেতে যোগ দিন ফেইসবুক, টুইটার, গুগল প্লাসে অথবা নিবন্ধন করুন ইমেইলে।