‘১৯৫২- নিছক কোন সংখ্যা নয়’:আধুনিক বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে এক অনবদ্য সংযোজন

1952আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মৌলিক থ্রিলারের ইতিহাস খুব একটা সমৃদ্ধ নয়। এইত কিছুদিন আগেও এই দেশের থ্রিলার প্রেমীদের তাদের আত্মতৃপ্তির জন্য বিদেশি লেখকদের দ্বারস্থ হতে হত। আর যারা ইংরেজি বই পড়তে অভ্যস্ত নন, তারা অপেক্ষা করতেন কবে সেইসব বইয়ের অনুবাদ বের হবে তার জন্য। তবে এখন সময় বদলেছে। আমাদের অনুবাদকরা বাইরের বই অনুবাদের পাশাপাশি নিজেরাও সৃষ্টি করে চলেছেন বিশ্বমানের থ্রিলার সাহিত্য। তেমনই একটি মৌলিক থ্রিলার বই- ‘১৯৫২- নিছক কোন সংখ্যা নয়’।

বইটির শুরু খুব সাদামাটা ভাবে। সায়েম মোহাইমেন, মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠা একজন বাঙালি যুবক, পেশায় দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকের সাংবাদিক, ছাত্রাবস্থা থেকেই যার আজন্ম লালিত স্বাদ ছিল একটা গাড়ির মালিক হবে। তাইতো বেশ কিছু টাকা জমতেই একটা রিকন্ডিশন গাড়ি কিনে নেয় সে। এবং সেখানেই কাহিনীর পট পরিবর্তন শুরু।

নতুন গাড়ি নিয়ে সায়েম প্রথম দিনই এক ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটিয়ে বসে। চাঁদনি রাতের আলোয় প্রেমিকার সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে আপন মনে ড্রাইভ করছিল সে। হঠাৎ করেই তার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে একজন মানুষ, একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ! যে ছেলেটি বন্ধুদের গাড়ি নিয়ে কোনদিন সামান্য একটা দূর্ঘটনা পর্যন্ত ঘটায় নি, তার নিজের গাড়ি কেনার প্রথম দিনই সে একজন মানূষ মেরে ফেলল! কিংকর্তব্যবিমূঢ় সায়েম পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হল।

গোলাম মাওলা, ধানমন্ডি থানার ওসি, সায়েমের বন্ধু। বন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়ার খবর শুনে দ্রুত ছুটে এলো থানায়। সায়েম হয়ত বেঁচেই যেত, কিন্তু ঠিক তখনই উদ্ধার হলো নিহতের পরিচিয়। সে প্রয়াত ভাষা সৈনিক আরিফ সূফীর নাতি আদনান সূফী। এখানেই তার পরিচয় শেষ নয়, সূফী পরিবার দেশের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবার। আদনান সূফী নিজেও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, দেশসেরা দশ জন ব্যবসায়ীর নাম বললে সেখানে আদনান সূফীর নাম আসতে বাধ্য। এই আদনান সূফীকে হত্যার দায়ে ফেঁসে যায় সায়েম।

নিশু, মাওলার ঠিক করে দেয়া সায়েমের ল-ইয়ার, আইন ব্যবসা থেকে ব্যান্ডের জন্য গান লিখতেই যার উৎসাহ বেশি, পরদিন কোর্টে ভয়াবহ এক বোমা ফাটাল। পোষ্ট-মর্টেম রিপোর্টের ভিত্তিতে সে দেখাল আদনান সূফীর মৃত্যু গাড়ির ধাক্কায় হয়নি, হয়েছে জিরো রেঞ্জ থেকে মাথায় গুলি খাওয়ার কারণে। তার মানে সায়েমের এক্সিডেন্টের আগেই মিঃ সূফী মারা গেছেন, কেউ একজন পরিকল্পিতভাবে তার হত্যাকান্ডকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু কে সে?

মৃত্যুর দিন আদনান সূফী তার গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিল, ভাষা সৈনিক আরিফ সূফীকে উপহার দেয়া প্রধানমন্ত্রীর চার ডিজিটের বিশেষ নাম্বারের গাড়ি। ১৯৫২- সেই বিশেষ গাড়ির নাম্বার, আদনান সূফীর মৃত্যুর পর সেই বিশেষ গাড়িটিও গায়েব। পুলিশ তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে টানা কয়েকমাস খুঁজেও সে গাড়ির কোন হদীস পায় নি। তাহলে ১৯৫২ গেল কোথায়?

পাঠক, বইটি পড়ার সময় হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বসবেন। কারণ, একের পর এক আপনার সামনে রহস্যের দুয়ায় উন্মোচিত হতে থাকবে, রুদ্ধশ্বাসে টানা পড়ে যেতে হবে। একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত আপনি উঠতে পারবেন না, বইটির টুইস্ট এবং সাসপেন্স আপনাকে বই শেষ করার আগে উঠতে দেবে না। কিন্তু তাই বলে ভাববেন না এর প্রতিটি পাতাই টান টান উত্তেজনায় ভরপুর। আসলে বইটি একটি প্রবাহমান বন্য নদীর মত- কোথাও খরস্রোতা, কোথাও ঘূর্ণি, আবার কোথাও শান্তভাবে বয়ে যাওয়া। উত্তেজনাকর অংশের পরেই থাকছে মন ভাল করা কিছু কথা, যা আপনাকে রিল্যাক্স মোডে নিয়ে যাবে।

বইটি শুধু সাসপেন্সেই ভরপুর না, এখানে আছে হালকা একটু রোমান্স, আছে বিরহ, আছে কান্না-হাসি, আছে সেক্রিফাইস, আছে ভাই-বোনের মমত্ব, গভীর ভালবাসা কিংবা প্রেমিকের দায়িত্ববোধ, আছে অনুশোচনা, আছে পিতৃ-স্নেহ, আছে ক্ষমতার লোলুপ, আছে রজনৈতিক চক্রান্ত, আছে অন্ধকার পাপ রাজ্যের কথা, আছে বখে যাওয়া তরুণ সমাজের কথা, আর আছে সে অমর সত্যের বাস্তব প্রতিফলন- পাপ তার বাপকেও ছাড়ে না! তাহলে বলুন তো কি নেই এতে?

বইটির লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, পেশায় একজন অনুবাদক, বাতিঘর প্রকাশনীর ব্যানারে যিনি দীর্ঘদিন যাবৎ এদেশের মানুষকে নিজ ভাষায় বিশ্ববিখ্যাত সব বই পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। ‘১৯৫২- নিছক কোন সংখ্যা নয়’ বইটি নাজিম উদ্দিনের ৬ষ্ঠ মৌলিক থ্রিলার, গত বইমেলায় (ফেব্রুয়ারি,২০১৪) এটি প্রকাশিত হয়েছিল। ৪১১ পৃষ্ঠার এই অসাধারণ বইটির গায়ে লেখা মূল্য ৩৪০ টাকা, তবে ঢাকায় বাংলাবাজারে অবস্থিত বাতিঘরের নিজস্ব শো-রুম থেকে কিনলে পাঠক ৫০ শতাংশ ছাড় পাবেন।

এক নজরে-
নামঃ ১৯৫২- নিছক কোন সংখ্যা নয়
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪
প্রকাশকঃ বাতিঘর প্রকাশনী
পৃষ্ঠাঃ ৪১১
মূল্যঃ ৩৪০ টাকা

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করছি। পরামর্শ.কম এর অন্যান্য প্রকাশনার আপডেট পেতে যোগ দিন ফেইসবুক, টুইটার, গুগল প্লাসে অথবা নিবন্ধন করুন ইমেইলে।