অ্যাকুয়ারিয়ামে শখের মাছের যত্নআত্তি

4-Fish-Aquariumমানুষ বৈচিত্রপিয়াসী। বিচিত্র অথচ নান্দনিক জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ সহজাত। আমরা সাগর দেখতে ভালোবাসি, দেখতে ভালোবাসি পাহাড়, নদী। বিশাল সাগরের দিকে আমরা যখন তাকাই, মনের কোণে একটু হলেও হয়তো সবারই উঁকি দেয় একটা জিজ্ঞাসা, এই বিশাল সাগরের গভীরে কতই না নাম না জানা মাছ আছে! আছে হিংস্র, মাংসাশী মাছ, আছে বিশাল আকারের অদ্ভুত রকম মাছ। আর আছে অসাধারণ সুন্দর অনেক রকম মাছ। অনেকেরই হয়তো ইচ্ছা হয়, এই যে নানান রকম মাছের যে অনিন্দ্যসুন্দর মিলনমেলা, এই দৃশ্য যদি সবসময় চোখের সামনে থাকতো? মনটা একটু খারাপ থাকলে, অথবা ইচ্ছা হলেই জলের সাথে মাছের খেলা দেখে সময় কাটিয়ে দেওয়া যেত?

সুপ্রিয় পাঠক, এটা কোন আকাশকুসুম কল্পনা নয়। আপনি ইচ্ছা করলেই এই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন। আপনারই বাড়িতে। আর আপনার এই স্বপ্নকে সত্যি করবেঃ অ্যাকুয়ারিয়াম। আপনাদের সবার কাছেই এটি অত্যন্ত পরিচিত। বড় কোন রেস্টুরেন্ট এ অথবা অনেকেরই বাড়িতেই বিভিন্ন সাইজের অ্যাকুয়ারিয়ামের দেখা মেলে। অনেক মনোবিজ্ঞানীর মতে, ঘরে অ্যাকুয়ারিয়াম থাকলে মনও নাকি ভালো থাকে। এদিকে চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলেন, অ্যাকুয়ারিয়াম আপনার চোখের পক্ষেও বেশ আরামদায়ক ও উপকারী। এগুলোর বাইরেও নিঃসন্দেহে বলা যায়, একটি অ্যাকুয়ারিয়াম আপনার ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। এতসব গুণের কথা জেনে আপনিও নিশ্চয়ই আগ্রহী হচ্ছেন অ্যাকুয়ারিয়ামের প্রতি। উল্টোদিকে আবার ভাবছেন, মাছের এতসব জটিল যত্ন-আত্তি আপনার পোষাবে না। কিন্তু সত্যি বলতে কি, সামান্য কিছু নিয়ম ছাড়া বাড়তি আর কোনো কিছুই ভাবতে হবে না আপনাকে। সবকিছু বিবেচনা করে ঘরের জন্য যদি অ্যাকুয়ারিয়াম কেনার কথা ভেবে থাকেন, তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক, এজন্য কী কী জিনিস লাগবে, আর কী কী করতে হবে।

জায়গা বুঝে অ্যাকুয়ারিয়ামঃ অ্যাকুয়ারিয়াম কেনার আগে প্রথমেই নির্বাচন করতে হবে ঘরের কোথায় সেটি রাখবেন। এ বিষয়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার গুলশান নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘ঘরের প্রবেশপথটাই অ্যাকুয়ারিয়াম রাখার উপযুক্ত স্থান। জায়গা না থাকলে ড্রয়িং বা ডাইনিং রুমে রাখতে পারেন। এজন্য ঘরের পুরো একটি দেয়াল অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য আলাদা করতে হবে। দেয়ালের আয়তন ১০ ফুট বাই ২০ ফুট হলে অ্যাকুয়ারিয়ামের আয়তন হবে ২ ফুট বাই ৫ ফুট। এতটা জায়গা একসঙ্গে পাওয়া না গেলে জায়গার আয়তন অনুযায়ী অ্যাকুয়ারিয়াম নির্বাচন করুন। ঘরে যদি একেবারেই জায়গা না থাকে, তাহলে মাছ রাখতে কাচের জারও ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে ঘরের যেকোনো একটি কর্নারে কাচের জারে রাখুন ছোট আকারের মাছ। আরো একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আলো বা দিনের কিছুটা সময় রোদ পড়ে— এমন জায়গায় অ্যাকুয়ারিয়াম রাখা উচিত। এতে মাছ ভালো থাকবে।

শুরুতে যা যা লাগবেঃ একটি অ্যাকুয়ারিয়াম, এয়ার পাম্প, ফিল্টার, কিছু পাথর আর জীবাণুনাশক লাগবে শুরুতেই। সর্বপ্রথম কাজ হলো অ্যাকুয়ারিয়াম নির্বাচন। একসময় কাঁচের অ্যাকুয়ারিয়াম ছাড়া আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। দিন বদলেছে। এখন অধিকাংশ মানুষের পছন্দের অ্যাকুয়ারিয়াম হলো অ্যাক্রিলিক অ্যাকুয়ারিয়াম। এগুলো আসল কাঁচের অ্যাকুয়ারিয়াম থেকে শ্রেয়তর, কারণ বাস্তবে অ্যাক্রিলিক কাঁচের তুলনায় সতের গুণ শক্তিশালী। অ্যাকুয়ারিয়ামের ভেতরটা সাজাতে নানা রকম খেলনা এবং তাজা গাছ লাগতে পারেন। কোন ধরণের ফিল্টার বা ছাকুনি ব্যবহার করা হবে তা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। কিছু অ্যাকুয়ারিয়ামের ছাকুনি কেবলমাত্র লোনা পানির জন্য বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়, এবং অন্যগুলো মিঠা পানির অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য ব্যবহার করা হয়। অ্যাকুয়ারিয়ামের এই ছাকুনিগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে, কিন্তু এগুলোর কাজ একই এবং তা অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করে।

অ্যাকুয়ারিয়াম স্ট্যান্ডঃ বাজারে হরেক রকমের অ্যাকুয়ারিয়াম স্ট্যান্ড পাওয়া যায়। এগুলো যেকোনো ধরণের কাঠ দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে এবং অ্যাকুয়ারিয়ামের আকৃতির উপর নির্ভর করে এই সকল স্ট্যান্ড নির্বাচন করতে হয়। এক ধরণের স্ট্যান্ড আছে যার উপর অ্যাকুয়ারিয়ামটি সরাসরি রাখা যায় এবং অন্যদিকে ক্যাবিনেট আকৃতির স্ট্যান্ড সম্পূর্ণ অ্যাকুয়ারিয়ামকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে রাখে। একটি উন্নতমানের অ্যাকুয়ারিয়াম স্ট্যান্ডের জন্য অ্যাকুয়ারিয়াম স্টোরগুলো হলো আদর্শ জায়গা।

অ্যাকুয়ারিয়ামের আলোকসজ্জাঃ যখন কারও অ্যাকুয়ারিয়ামে আলোকসজ্জার প্রয়োজন হয়, তখন এর জন্য অনেক রকম বিকল্প রয়েছে। কিছু অ্যাকুয়ারিয়ামের আলোকসজ্জা অ্যাকুয়ারিয়ামের ঢাকনাতে ব্যবহার করা হয়। এই অবস্থায় যখন তা চালু করা হয়, তখন তা সমগ্র অ্যাকুয়ারিয়ামটিকে মৃদু আলোয় আলোকিত করে। অ্যাকুয়ারিয়ামে যে সকল লাইট ব্যবহার করা হয় সেগুলোর অধিকাংশই এলইডি লাইট এবং সবসময় এই লাইটগুলোকে চালু না রেখে নিয়ন্ত্রিতভাবে চালু রাখার জন্য টাইমার ব্যবহার করা যায়।

অ্যাকুয়ারিমের সাজসজ্জাঃ যেকোনো অ্যাকুয়ারিয়ামের সজ্জার ক্ষেত্রে অ্যাকুয়ারিয়ামের পাথর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পাথরগুলো মাছের লুকানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো যেকোনো প্রদত্ত অ্যাকুয়ারিয়ামে একটি অনন্য পরিবেশ নিশ্চিত করে। অনেকে রঙিন পাথর দিয়ে অ্যাকুয়ারিয়াম রঙিন করে তোলেন। অ্যাকুয়ারিয়ামের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ডেকোরেশন পিসও রাখতে পারেন। ঝরনা, বল বা পুতুল বেশ সাজিয়ে তুলবে রঙিন মাছের বাসাটি। অ্যাকুয়ারিয়ামে সামুদ্রিক পরিবেশ আনতে শামুক, ঝিনুক ও বড় পাথর দিতে পারেন। এ ছাড়া সবুজ গাছ বা রঙিন ফুল দিয়েও সাজাতে পারেন পানির জার বা অ্যাকুয়ারিয়াম।

home 13 copyএবার আসা যাক যাকে কেন্দ্র করে এই অ্যাকুয়ারিয়াম অর্থাৎ মাছের কথায়।

অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য মাছঃ সব মাছ অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা যায় না। বিশেষ কিছু মাছই রয়েছে যেগুলো অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখার জন্যই চাষ করা হয়। আমাদের দেশে অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখার মতো অনেক মাছ পাওয়া যায়। যেমনঃ গোল্ডফিশ, অ্যাঞ্জেল, শার্ক, টাইগার বার্ব, ক্যাটফিশ, গাপ্পি, মলি, ফাইটার, সাকার, সিলভার ডলার, অস্কার, কার্প, হাইফিন নোজ, এলিফ্যান্ট নোজ, টেট্রা, অ্যারোনা, রোজি বার্ব, কমেট, কিসিং গোরামি, ব্ল্যাক অরেন্ডা ইত্যাদি। তবে অ্যাকুয়ারিয়ামে গোল্ডফিশ প্রজাতির মাছ রাখতেই বেশি দেখা যায়। এরা বেশ কষ্টসহিষ্ণু ও অক্সিজেন ছাড়া কয়েক দিন বেঁচে থাকতে পারে। এদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও অন্য মাছের চেয়ে বেশি।

মাছের খাবারঃ মাছকে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। মাছের দু’ধরনের খাবার প্রচলিত আছেঃ ১. সজীব খাবার ২. শুকনা খাবার। সজীব খাবারের মধ্যে মাছের প্রিয় খাদ্য কেঁচো। খুব অল্প দামেই বাজারে কেঁচো পাওয়া যায়। তবে অনেকেই কেঁচো সহ্য করতে পারে না। তাদের জন্য বাজারে শুকনা প্যাকেট খাবার বিভিন্ন বাণিজ্যিক নামে পাওয়া যায়, যা দেখতে সরিষার দানার মতো। সাধারণ হিসাবে মাছপ্রতি একটি দানা সকাল ও রাতে খাবার দিতে হবে। কখনোই মাছকে বেশি খাবার দেবেন না। এতে ফল হবে উল্টো।

মাছের যত্নঃ ঠিকমতো যত্ন পেলে মাছ মারা যাবে না। অ্যাকুয়ারিয়ামের পানি মাসে একবার বদল করতে হবে। ১৫ দিন পর পর অর্ধেক পানি ফেলে নতুন পানি দিতে হবে। এক্ষেত্রে ফিল্টার করা সাধারণ তাপমাত্রার পানি দিন। সরাসরি ট্যাপের পানিতে অনেক সময় ব্লিচিং পাউডারসহ নানা রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মাছের জন্য ক্ষতিকর। প্রতিবার পানি বদলের পর পানিতে ব্লু, ওয়াটার কেয়ার, ফাঙ্গাস প্রতিরোধক ফানজিডাল ও কিছুটা অ্যাকুয়ারিয়াম সল্ট দিতে হবে। এগুলো অ্যাকুয়ারিয়ামের দোকানেই পাবেন। এতে মাছ সুস্থ থাকবে।

কোথায় পাবেনঃ রাজধানীর কাঁটাবনে রয়েছে অ্যাকুয়ারিয়াম ও রঙিন মাছের বিরাট বাজার। চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কাঁচ বা প্নাস্টিকের জার পাবেন এখানে। একদম ছোট থেকে শুরু করে বিশাল সাইজের অ্যাকুয়ারিয়ামও পেয়ে যাবেন কাঁটাবনে। তবে কেনার সময় ঘরের কোথায় রাখা হবে তা মাথায় রেখে কিনবেন। পাশাপাশি ঘরের আকৃতির কথাও খেয়াল রাখা জরুরি।

দরদামঃ প্রজাতিভেদে বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত মাছের দাম জোড়াপ্রতি ৫০ থেকে ৩০০ টাকা। আর বাইরে থেকে আমদানি করা প্রতি জোড়া পড়বে ৮০ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। অ্যাকুয়ারিয়ামের বক্সের দাম ২০০ থেকে ৫ হাজার টাকা। চীন থেকে আসা বিভিন্ন বক্স পাওয়া যাবে ১ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায়। কেউ চাইলে পছন্দমতো অ্যাকুয়ারিয়াম বক্স বানিয়ে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে অ্যাকুরিয়ামের দোকানে অর্ডার করতে হবে। এছাড়া অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য এয়ারপাম্প ১২০ থেকে ৪ হাজার ৫০০, পাওয়ার ফিল্টার ৩৫০ থেকে ৮০০, কালার টিউব লাইট ১৫০ থেকে ৩৫০, এয়ার এক্সিকিউটর ১৫০ থেকে ৩০০, পাথরকুচি প্রতি কেজি ১৫-২০ ও মাছের প্যাকেটজাত খাবার পাওয়া যাবে ৩০ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, যা মনে রাখতে হবেঃ

  • অতিরিক্ত খাবার দেবেন না।
  • মাছ হাত দিয়ে না ধরে নেট ব্যবহার করুন।
  • সাবান দিয়ে অ্যাকুয়ারিয়াম ও অ্যাকুয়ারিয়ামের পাথর পরিষ্কার করবেন না।
  • ফিল্টার পরিষ্কার রাখুন।
  • লাইট ব্যবহারের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন, যেন আলো বেশি হয় এবং তাপ কম হয়।
  • শীতের সময় হিটার ব্যবহার করুন।
  • কচ্ছপ এবং মাছ একসঙ্গে রাখবেন না।

তাহলে আর দেরি কেন? আপনার নিজের ঘরেই বানিয়ে নিন একটুকরো সাগর!

(তথ্য ও উপাত্ত সংগৃহীত)

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করছি। পরামর্শ.কম এর অন্যান্য প্রকাশনার আপডেট পেতে যোগ দিন ফেইসবুক, টুইটার, গুগল প্লাসে অথবা নিবন্ধন করুন ইমেইলে।